আমিই মেয়র হবো ইনশাআল্লাহ : তৈমুর

এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী। জেলা বিএনপির সভাপতি, বিআরটিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান। তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা দু-ই আছে নারায়ণগঞ্জে। নির্বাচনকে সামনে রেখে মানবজমিন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন- আমিই সিটি মেয়র হবো ইনশাআল্লাহ। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে আমি জয়ী হবো, এটা নিশ্চিত। তবে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনকে যদি সরকার তার জন্য কাজ করার চাপ দেয়, তাদের ভয় দেখায়, তাহলে তাদের ধৃষ্টতা নেই সরকারের বিপক্ষে কাজ করার। তৈমুর বলেন, নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেনের উপস্থিতিতে আমি বলেছি, আপনারা নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ টাকা বেঁধে দিয়েছেন। এ টাকা প্রয়োজনের তুলনায় কম। কারণ, পুলিশ প্রশাসনকে টাকা না দিলে তারা আমার জন্য কাজ করবে না। যে টাকা দেবে তার জন্য কাজ করবে। তাদের টাকা দিতে না পারলে আমি জয়ী হতে পারবো না। সাখাওয়াত হোসেন নিজেও বলেছেন, তারা এ ধরনের প্রমাণ পেয়েছেন এর আগেও। তৈমুর আলম বলেন, আমি দলের হাইকমান্ডের সিগন্যাল পেয়েই মাঠে নেমেছি। ম্যাডাম নারায়ণগঞ্জের নেতাদের ডেকে বলে দিয়েছেন তৈমুর আমাদের প্রার্থী, আপনারা সবাই তার জন্য একযোগে কাজ করুন। নারায়ণগঞ্জে আমাদের জিততে হবে। আশা করি আপনারা নিরাশ করবেন না। ম্যাডামের নির্দেশের পর এখন সবাই আমার জন্য কাজ করছেন।
আপনাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি’তে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, আপনার বিরোধীপক্ষ রয়েছে, তারা কি আদৌ আপনার পক্ষে কাজ করবেন? তৈমুর বলেন, বিরোধিতা রাজনীতিতে সব জায়গায়ই কম আর বেশি আছে। আমাদের এখানেও কিছুটা বিরোধ ছিল। এখন সেই বিরোধ আমরা মিটিয়ে ফেলেছি। এখন কোন বিরোধ নেই। ব্যক্তি আমার জন্য না, দলের জন্য সবাই কাজ করছেন। বুকে বুক মিলিয়ে সমস্যার সমাধান করেছি।
আপনি কি মনে করেন আওয়ামী লীগের দু’জন প্রার্থী হওয়ায় বিশেষ সুবিধা পাবেন? তৈমুর বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এখনও জানে না তাদের দলের প্রার্থী কে? তাদের দলের দু’জন প্রার্থী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি একা প্রার্থী, আমাকে কেবল ভোট চাইতে হচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে কেন ভোট দেয়া যাবে না তা বলছি। ম্যাডাম এখানে সাবেক এমপি আবুল কালামকে আহ্বায়ক করে দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে সবাই কাজ করছেন।
সরকারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসী কি ভাবছেন? তৈমুর বলেন, দেশের মানুষ বোকা নন। তাদের চোখ-কান খোলা। তারা খুব ভাল করেই সরকারের অবস্থা জানেন। সরকার গত আড়াই বছরে জাতীয় পর্যায়ে রুটিন কাজ ছাড়া বিশেষ কোন কাজ করেনি। এখানে রাস্তাঘাট হয়নি। জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি। গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করতে পারছে না। এমন কত ব্যর্থতা সরকারের কর্মকাণ্ডকে নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ সরকার চরমভাবে ব্যর্থ। তাই সরকারের ব্যর্থতায় জনগণ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনে তা প্রমাণ হয়ে যাবে।
নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হওয়ার জন্য কি করণীয় আছে বলে আপনি মনে করেন? নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর কর্তৃত্ব করা যাবে না। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ইভিএম পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। এগুলো হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
সেনা মোতায়েন ও ইভিএম বাতিলের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কি বলেছেন? তৈমুর আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি তুলে ধরেছি। তারা শুনেছেন কিন্তু দেবেন- এমন কোন নিশ্চয়তা দেননি। সেনা মোতায়েন না করলে নির্বাচনে সরকার প্রভাব খাটাবে, তারা মেয়র পদটি যে কোন মূল্যে নিয়ে নিতে পারে। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট কারচুপির আশঙ্কা ছাড়াও এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা নেই। সে হিসেবে তারা ভালভাবে ভোট দিতে পারবেন না। আমার এ দু’টি দাবি নির্বাচন কমিশনকে মানতে হবে।
নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জে কি ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বলে ঠিক করেছেন? তৈমুর আলম বলেন, মেয়র হতে পারলে নারায়ণগঞ্জকে আধুনিক শহরে পরিণত করবো। এখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় করবো। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করবো। নদী পারাপারে সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। এলাকায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যা রয়েছে, তা নিরসন করতে হবে। রাস্তাঘাট তৈরি ও সংস্কার করা হবে। ফেরি পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া খালগুলো চালু করবো। যানজট দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেবো। এছাড়া আরও অনেক পরিকল্পনা আছে।
শামীম ওসমান মেয়র হতে পারলে স্কাই সিটি, ট্যুরিজম সিটি, শাটল ট্রেন চালু করবেন। এটা কি সম্ভব? তৈমুর বলেন, নারায়ণগঞ্জকে স্কাই সিটি করা এটি আকাশচুম্বী কল্পনা। এটা সম্ভব হবে না। কারণ, সব মানুষ এতে রাজি হবে না। এটি তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। ট্যুরিজম সিটি বেসরকারি অর্থায়নে করা গেলে সম্ভব হতে পারে। শাটল ট্রেন সার্ভিস ঢাকা থেকে চালু করা গেলে ৭-৮ লাখ মানুষের চলাচলে অনেক সুবিধা হবে। এটি আমার পরিকল্পনায়ও রয়েছে। এছাড়া মেইল ট্রেন এবং চাঁদপুর পর্যন্ত স্টিমার সার্ভিস চালু করবো।
নারায়ণগঞ্জবাসীর মধ্যে আপনাকে নিয়ে বিরূপ ধারণা রয়েছে- আপনি দুর্নীতিবাজ, মেয়র হলে আরও দুর্নীতি করবেন? আপনি কি বলেন? তৈমুর বলেন, নারায়ণগঞ্জের কেউ কেউ এ ধরনের অপপ্রচার বিশ্বাস করতে পারে, তবে সবাই নন। আমি তৃণমূল পর্যায় থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি হয়েছি। যোগ্যতা না থাকলে কি হয়েছি? দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই আমি দুর্নীতিবাজ নই। জীবনে একটি দুর্নীতি করেছি, আর সেটি হলো বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান থাকাকালে এলাকার এক হাজার মানুষকে চাকরি দিয়েছি। এটা অন্যায় হলেও তা আমি করেছি। আমার এলাকার মানুষকে কেউ চাকরি দেয় না। আমি সাহস করে দিয়েছি। বিনিময়ে আমি কারও কাছ থেকে কোন টাকা নেইনি। ঘরের ছেলেকে চাকরি দিয়ে টাকা নেবো কেন? টাকা নেয়ার ইচ্ছা থাকলে বাইরের ছেলেদের চাকরি দিতাম। দুদক আমার দুর্নীতির তদন্ত করেছে। কোন প্রমাণ পায়নি। চাকরি দেয়ার জন্য টাকা নেইনি, এটিও তারা প্রমাণ পেয়েছেন। দুর্নীতিবাজ হলে আমার ঢাকায় বাড়ি থাকতো। ঢাকায় আমার আধা শতক জমিও নেই, বাড়ি তো দূরের কথা। একটা চায়ের দোকানও নেই।
আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, শামীম ওসমানের ওপর আপনার পরিকল্পনায় বোমা হামলা হয়েছে। আপনার বাড়িতে বোমা তৈরি হয়েছে। এটা কি সত্য? তৈমুর বলেন, আমি শামীম ওসমানের ওপর বোমা হামলা করিনি। পরিকল্পনাও করিনি। আমার বাড়িতে বোমা তৈরি হয়েছে একথা একেবারেই মিথ্যা। আমি কেন তার ওপর বোমা হামলা করতে যাবো? বোমা হামলা না করলেও আমাকে ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে। অথচ ওই ঘটনায় সিআইডি’র তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিচারপতি আবদুল ওহাবের নেতৃত্বে তদন্ত হয়েছে। ওই তদন্তেও কোন প্রমাণ মেলেনি। আমি শামীম ওসমানের এ ঘটনাটি নিয়ে এতদিন দারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। গত বুধবার যখন নির্বাচন কমিশনে শামীম বললেন, আমি তার ওপর বোমা হামলা করিয়েছি, আমার বাড়িতে বোমা বানানো হয়েছে, এটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তার একথার মধ্য দিয়ে আমার মানসিক যন্ত্রণার অবসান হয়েছে। তবে শামীম একথা বলার মধ্য দিয়েও একটা রাজনৈতিক স্ট্যান্ড নিয়েছেন, সেটাও আমি বুঝি।
আপনার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মদত দেয়ার অভিযোগ রয়েছে, এ সম্পর্কে কি বলবেন? তৈমুর বলেন, এসব কাজ আমি করি না। আমি যখন শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে মিছিল করেছিলাম তখন আমাকে হত্যার জন্য মিছিলে গুলি করা হয়েছিল। একজন মারাও যায়। আসলে বিভিন্ন সময় রাজনীতি করার কারণে আমাকে অনেক হামলা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আমার বাড়িতে হামলা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি নির্যাতনের শিকার। আমাকে ডিটেনশন দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলগেট থেকে বন্দি করা হয়েছে। সন্ত্রাসের মদতদাতা হলে আমি এসব ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতাম। তা নেইনি। মূলত আমার কারণে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজকর্ম করতে অসুবিধা হওয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়েছে। এখনও ২২টি মামলার আসামি আমি।
কিন্তু শামীম ওসমানের নামের পাশে তো একটি গডফাদার নামের বিশেষ উপাধি আছে, আপনি কি বিশ্বাস করেন তিনি গডফাদার? তৈমুর বলেন, আমি এখন একজন প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে তা নির্বাচন বিধিমালা ভঙ্গের মধ্যে পড়বে। তাই তার বিরুদ্ধে কিছু বলে নির্বাচনী বিধিমালা ভঙ্গ করতে চাই না। নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাসের জনপদ, এখানে সন্ত্রাস কতটা আছে, কারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে এগুলো মানুষ জানেন। শামীম ওসমান কেমন, কি করেছেন না করেছেন এটা নতুন করে আমার বলার দরকার নেই। সব সময় বলে এসেছি।
পরিশেষে আপনি কি নির্বাচন কমিশনের কাছে কোন দাবি রাখতে চান? তৈমুর বলেন, আমি প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা চাই। যাতে কি হচ্ছে না হচ্ছে এর প্রমাণ থাকে। নমিনেশন পেপারটি তারা এত কঠিন করেছে যে, এটা আরও সহজ হওয়া দরকার। সেখানে হিসাব চেয়েছে আমার কত জোড়া জুতা, মোজা, গেঞ্জি আছে। এগুলোর হিসাব কি আমার পক্ষে রাখা সম্ভব? আমি সংসারের কোন কাজই করি না। আমার ক’টা গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, মোজা আছে, জুতা আছে তা-ও বলতে পারবো না। বিয়ের আগে বাবার বাড়িতে মেহমান ছিলাম। এখন বউয়ের কাছেও মেহমানের মতোই। এখন নির্বাচনী আইন মেনে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। নির্বাচনী বিধিমালাটি অনেক কঠিন। সেখানে বলা হয়েছে, ৯ তারিখের আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। আপনারাই বলুন, মাত্র ২১ দিনে ৪ লাখ ভোটারের কাছে ভোট চাওয়া সম্ভব?
এক্ষেত্রে শামীম ওসমান প্রস্তাব করেছেন সব প্রার্থীর জন্য একই মঞ্চ তৈরি করে সেখানে বক্তৃতার ব্যবস্থা করার। আপনি কি বলেন?
এটা হতে পারে। খুব ভাল প্রস্তাব। করতে পারলে ভাল হবে। একমঞ্চে সবাই ভোটারদের উদ্দেশে স্ব-স্ব বক্তব্য তুলে ধরলাম, তারা জানলো, কষ্টও কম হলো।

সূত্রঃ মানবজমিন | ২ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in মানবজমিন. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s