আইভীকে যত ভয় শামীম-তৈমুরের

 নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত দুটি নাম শামীম ওসমান ও তৈমুর আলম খন্দকার। তারা বড় দুটি দলের বড় নেতা। নানা কারণে তারা বারবার ওঠে এসেছেন আলোচনায়, বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে হয়েছেন সমালোচিত। কিন্তু তাদের ছাড়িয়ে এখন আলোচনার শীর্ষে ওঠে এসেছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।
স্থানীয়দের অভিমত, শামীম ওসমান এবং তার ভাইদের কাজের তীব্র সমালোচনা আর তাদের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয়ার জন্যই আইভী এতটা আলোচিত। সাধারণ মানুষও আইভীকে শান্তির ‘প্রতীক’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ওসমান ভ্রাতৃত্রয়ের নেতিবাচক ইমেজ এবং ৮ বছর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র থাকার সময়ে উন্নয়নের চিত্রকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন নির্বাচনে বাজিমাত করতে চান আইভী।
অপরদিকে শামীম ওসমান চাচ্ছেন এমপি থাকাকালীন তার উন্নয়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভোটারদের কাছে টানতে। নিজের গডফাদারের তিলক মুছে ফেলে আধুনিক নারায়ণগঞ্জ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হতে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই উপস্থিত রাখার চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের। আর তৈমুর চাচ্ছেন তার ব্যক্তি ইমেজ ও ঐক্যবদ্ধ বিএনপিকে কাজে লাগিয়ে জয়ী হতে। এক্ষেত্রে শামীম ওসমান এবং তৈমুর একে অন্যকে ভয় না করলেও তাদের বড় ভয় আইভীকে নিয়েই।
২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বা-চনের আগে শহরের অধি-কাংশ লোক আইভীর নাম জানতেন না। নির্বাচনের মাত্র ১৭ দিন আগে নিউজিল্যান্ড থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে চেয়ারম্যান প্রার্থী করা হয়। আওয়ামী লীগের সমর্থন ও তার মরহুম পিতা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকার নামের ওপর ভর করে তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। তখন থেকেই আইভী আলোচনায় চলে আসেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ শহরের বেহাল রাস্তাঘাট, বাজে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে আইভী ২০০৪ সালের বন্যার পর ব্যাপক সমালোচিত হন। তখন থেকেই আইভী সমালোচনা বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। সে সময় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে আইভী সরকারের কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পাননি বলেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি দ্বারস্থ হন তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিআরটিসির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের। তৈমুরের সঙ্গে আইভীর প্রয়াত পিতা আলী আহাম্মদ চুনকার ছিল গভীর সখ্য। তৈমুর ছিলেন চুনকার একনিষ্ঠ ভক্ত। এ কারণে তৈমুরকে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে চাচা ডাকতেন আইভী। সে সময়ে তৈমুর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করে নারায়ণগঞ্জ শহরের বেহাল সড়ক সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ের তহবিল বরাদ্দ করান। সে সময়ে আইভীর পক্ষে তৈমুর কাজ করায় তিনি কিছুটা সমালোচিতও হন দলের ভেতরে। এরই মধ্যে আইভীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার তৎকালীন ৯ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৭ জন। তারা নানাভাবে চেষ্টা করেন আইভীকে তার পদ থেকে হটাতে। অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনার পেছনে বিএনপির একটি গ্রুপ তখন কাজ করেছিল। দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন ও তার বিরুদ্ধে অনাস্থার প্রস্তাব ওঠার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠন করে তদন্ত কমিটি। কিন্তু তদন্তে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। তখন এ বিষয়টি নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে দাগ কাটে। তারা আইভীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র মনে করতে থাকেন। এক পর্যায়ে অনাস্থা প্রস্তাব আনা কাউন্সিলররা নিজেরাই ভুল বুঝে তার সঙ্গে যোগ দেন।
আইভীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দুই বছর ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। তখন পৌর এলাকার লোকজন তাকে সানন্দে গ্রহণ করেনি। কিন্তু পরে যখন পৌরবাসী সুবিধা ভোগ করতে শুরু করে তখন তারা আইভীকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন।
২০০৫ সালে শহরের বেহাল রাস্তাঘাটের সংস্কার হওয়ার পর আইভীর বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমশ চাপা পড়তে থাকে। সে সময় আইভী কর আদায়ে মনযোগ দেন। শুরু করেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে বোঝানোর কাজ। আইভী তখন কাউন্সিলরদের নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে গণসংযোগ করে কর আদায় শুরু করেন। মানুষও ধীরে ধীরে কর দিতে এগিয়ে যান। পরে ট্যাক্সের টাকায় ড্রেন, বড় বড় রাস্তা এবং শহরে বাতি জ্বলে।
আইভী শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। পাড়া-মহল্লার রাস্তা করেছেন প্রশস্ত। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে দখল করা খালগুলো উদ্ধার, গভীর ড্রেন নির্মাণ হয়েছে। চলছে দুটি শিশুপার্ক নির্মাণের কাজ। সাধারণ মানুষের সেবায় একটি হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠেছে, নারীদের ক্ষমতায়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর আওতায় ৭০ হাজার নারী নানা ধরনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। হাতের কাজ শিখে এরই মধ্যে একদল নারী একটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় পৌর শহীদ মিনারটি আগে ছিল শুধু একটি ইটের স্তম্ভ। আইভী চেয়ারম্যান হওয়ার পর এটাকে সুন্দর স্থাপনায় রূপান্তর করেন। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শত শত মানুষ এ শহীদ মিনারে আড্ডা দেয়। শহরে কোনো কেন্দ্রীয় মসজিদ ছিল না। মাসদাইর পৌর কবরস্থান লাগোয়া মাসদাইর মসজিদটিকে এখন কেন্দ্রীয় মসজিদে রূপান্তর করা হচ্ছে।
আইভী ২০০৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি চেয়ারে বসেছিলেন, তখন পৌরসভার দেনা ছিল দুই কোটি আট লাখ টাকা। গত ২৭ জুন তিনি যখন পদ ছেড়ে আসেন, তখন পৌরসভায় জমা ছিল ১২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, আরো ৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছিল।
তিনি মেয়র হওয়ার আগে পৌরসভার নিজস্ব রাস্তা ছিল ৭৮ কিলোমিটার। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সেটা বাড়িয়ে করেছেন ১৪০ কিলোমিটার। আগে পৌরসভার বিভিন্ন কর আদায় হতো গড়ে ৩০ শতাংশ। তিনি সেটা ৯০ শতাংশে উন্নীত করেছেন।
এসব উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে আইভী কখনো কঠোর হয়েছেন। বিশেষ করে পৌরসভার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে আইভীকে প্রায় সময়ে অগি্নমূর্তি ধারণ করতে দেখা গেছে। এতে কিছু মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ হলেও সামগ্রিকভাবে মানুষ তার এ কর্মকা-কে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন।
সংসদ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জ ফিরে আসেন শামীম ওসমান। কিন্তু তার বিভিন্ন কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন আইভী। এ কারণে আইভী আবারো আলোচনায় চলে আসেন।
স্থানীয়দের মতে, ১৯৮৬ সালে নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টির এমপি নির্বাচিত হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি মহাজোট থেকে এমপি হন। এর আগে ১৯৯৬ সালে এমপি হয় শামীম ওসমান। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাই ওসমান ভ্রাতৃত্রয়ের প্রভাব অনেক। তাদের ইশারা ছাড়া নারায়ণগঞ্জে কোনো কিছুই হয় না। তারা নিজেদের নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মনে করেন। কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। কিন্তু আইভী প্রকাশ্যে কথা বলায় তিনি নারায়ণগঞ্জে হিরো বনে যান।
এ ব্যাপারে আইভী যায়যায়দিনকে বলেন, তিনি সর্বদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। হয়তো এটা অনেকের বিরুদ্ধে গিয়েছে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের অনেক সিংহপুরুষ দাবি করা ব্যক্তিরা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ২০০৩ সালে পৌরসভার মেয়র হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। দলের দুর্দিনে যারা নির্যাতন পোহাবে তারাই তো ক্ষমতায় এলে লাভবান হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতায় থাকলে নারায়ণগঞ্জে এসে সন্ত্রাসের রাজত্ব করবে, সিনিয়র নেতাদের গায়ে হাত তুলবে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, তাদের কথামতো সব চলবে এটা তো মেনে নেয়া যায় না। এ কারণেই তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। হয়তো শামীম ওসমান ও ভাই নাসিম ওসমান এবং তাদের লোকজন অন্যায় বেশি করেছে, সে কারণেই তার প্রতিবাদ তাদের ওপর গিয়ে বর্তেছে।
আইভী বলেন, তিনি যখন দেখেছেন এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন তখন দেখেন সাধারণ মানুষ তার পেছনে ভিড় করছেন। দিন যত যাচ্ছে ততই লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। তারা তাকে সাহস জুগিয়েছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান বলেন, শত্রুদের দৃষ্টিতে অপরাধ করেছেন বলেই ছয় বছর দেশের বাইরে থেকেছেন। ‘৭১ সালে যারা দেশের লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন আর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে সেসব রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের ২০০০ সালে নারায়ণগঞ্জের পবিত্র মাটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা, নারায়ণগঞ্জের কলঙ্ক পতিতাপল্লী উচ্ছেদ এবং তাদের পুনর্বাসন করার কারণে শত্রুদের চোখে তিনি অপরাধী বনে যান। তাদের নিয়ন্ত্রিত কিছু মিডিয়া ও হলুদ সাংবাদিকতার শিকার হয়ে তাকে গডফাদার উপাধি দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন তার নির্বাচনী এলাকাতে ২৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করে অনেকের কাছে চক্ষুশুল হয়েছেন। তিনি কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত নন। প্রমাণ দিতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। শামীম ওসমান বলেন, দলের প্রাণ হলো তৃণমূল নেতাকর্মীরা। নাসিক নির্বাচনের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৫টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মীই তার সঙ্গে। তাছাড়া তিনি এমপি থাকার সময়ে অনেক উন্নয়ন করেছেন। তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়ন করবেন। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। আর দলের বাইরে গিয়ে কেউ সুবিধা করতে পারবে না। দল যেহেতু তার পক্ষে সেহেতু তিনি অনেক বেশি আশাবাদী।
এদিকে তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তিনি একজন সৎ লোক। তিনি রিকশাওয়ালা, ভ্যানগাড়ি থেকে শুরু করে অনেক খেটে খাওয়া মানুষের সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে তার প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে বিএনপি অনেক শক্তিশালী। যেসব নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল তার অবসান ঘটেছে। এ কারণেই তিনি আশাবাদী যে, নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেন। নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষও তাকে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি কখনো অন্যায় করেননি। কারো সম্পদও লুটপাট কিংবা সন্ত্রাসী কাজ করেননি। এতে করে তার একটা ইমেজ রয়েছে। সে ইমেজের কারণেই তিনি জয়ী হবেন ইনশাল্লাহ।

সূত্রঃ যায়যায়দিন | ১৯ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in যায়যায়দিন. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s