নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন-২০১১ : আওয়ামী উত্তাপে দুই পরিবার একই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্ম

 নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী সেই উত্তাপ ফের ফিরে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী আলী আহাম্মদ চুনকা ও শামসুজ্জোহা পরিবারে। পুরনো সেই একই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্ম। জোহা পরিবার থেকে সাবেক এমপি শামীম ওসমান এবং চুনকা পরিবার থেকে সাবেক মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী এখন মুখোমুখি। এর ফলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে অনেকের মুখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে জনমত ডা. আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার পক্ষে থাকলেও আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন দেয়া হয়েছিল খোকা মহিউদ্দিনকে। দলীয় এ হাইকমান্ডের পেছনে হাত ছিল শামীম ওসমানের বাবা শামসুজ্জোহার। ফলে আলী আহাম্মদ চুনকা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে জনগণ আছে এবং আমি আওয়ামী লীগ করি। নির্বাচনের পরই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।’ শামসুজ্জোহা তার বিশাল বাহিনী নিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করেও সে সময় খোকা মহিউদ্দিনকে জয়ী করাতে পারেননি।
ভোটারের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে জয়ী হয়েছিলেন ডা. আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা। সেটা ছিল স্বাধীনতার পর প্রথম পৌর নির্বাচন। এবার হচ্ছে সিটি করপোরেশন গঠনের পর প্রথম নির্বাচন। ফলে এবারের পরিস্থিতি ও পটভূমিও যেন একই। শুধু পাত্র-পাত্রীরা নতুন প্রজন্মের।
মূলত আওয়ামী লীগের ওই প্রভাবশালী দুই পরিবারের পুরনো সেই ইতিহাসেই নাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ শহর পরিণত হয়েছে গুজবের শহরে। আওয়ামী লীগের সমর্থনকে নিয়ে প্রতি মুহূর্তে নিত্যনতুন গুজব ছড়িয়ে পড়ছে পাড়া-মহল্লা থেকে আনাচে-কানাচে। রোববার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেকে পাঠান সাবেক এমপি শামীম ওসমান ও সাবেক মেয়র আইভীকে। গণভবনে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে দুজনকে নিয়ে বৈঠক। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী আইভীকে নাসিক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব করেন। তিনি আইভীকে বলেন, সামনের সময়গুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত আসছে। রাজপথে তার শামীম ওসমানকে প্রয়োজন। শামীম ওসমান যেভাবে সংঘাত মোকাবিলা করতে পারবেন, তা আইভীর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এবার দলের প্রয়োজনে শামীম ওসমানকে দল থেকে সমর্থন দেয়া অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময়ে বর্তমান সময়েই আইভীকে মহিলা এমপি ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু সে প্রস্তাবে আইভী রাজি হননি। ফলে সমর্থনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।
এ ব্যাপারে আইভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের আগে তিনি মুখ খুলতে রাজি হননি। এদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পদে থাকা একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নাসিক নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি সমর্থন জানাতে ভুল করেন, তবে নারায়ণগঞ্জের বিশাল একটি অংশ চরমভাবে ক্ষুব্ধ হবে। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ রাজনীতি ওসমান পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে অনেক নেতাকর্মী রাজনীতির মাঠ থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন। দলের দুঃসময়ে যারা পালিয়ে যাবেন এবং তাদের অপকর্মকে মাথায় নিয়ে জনরোষের মধ্যেও নেতাকর্মীরা দলকে সংগঠিত রাখবেন আর দল ক্ষমতায় এলে বিদেশ থেকে ফিরে এসে তারাই পদ-পদবি দখল করবেন—এমন রাজনীতির সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত থাকবেন না। এটা স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের সিদ্ধান্ত। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধেই দলীয় নেতাকর্মীরা জোট সরকারের আমলে রাজপথে নেমেছিল। তাদের বঞ্চিত করার কোনো অবস্থা তৈরি করা হলে কোনোভাবেই তা মেনে নেয়া হবে না। আইভীকে সমর্থন দেয়া হলে আওয়ামী লীগ নিশ্চিতভাবে মেয়র পদটি ঘরে তুলতে পাারবে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দলীয় ভোট ছাড়াও সাধারণ ভোটারদের কাছে আইভীর গ্রহণযোগ্যতা নারায়ণগঞ্জের যে কোনো নেতার চেয়ে বেশি।
এদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে ভিন্ন কথা। সূত্রটি জানায়, নাসিক নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে। দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শামীম ওসমান এবং আইভীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী কৌশলগত কারণে এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতিতে শামীম ওসমানের অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। তাকে ধাক্কা দিলেই সরিয়ে দেয়া যাবে না। তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় নেতারা শামীম ওসমানের পক্ষে এরই মধ্যে দলের হাইকমান্ডকে তাদের সমর্থন জানিয়ে দিয়েছেন। এখন শুধু সিদ্ধান্ত পাওয়ার অপেক্ষা। সিদ্ধান্ত পেলেই পুরোদমে তারা ভোটযুদ্ধে নেমে পড়বেন। শামীম ওসমানকে সমর্থন দেয়া হলে তাদের মতে, সহজেই জয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন।
এদিকে নতুন সংশয়ে পড়েছেন বিএনপি সমর্থকরাও। ইভিএম পদ্ধতির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বয়কট করবে কিনা—সেটি তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না। তবে জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, নাসিক নির্বাচন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ নির্বাচনের ফলাফলে ঘুরে যেতে পারে জাতীয় রাজনীতির মোড়। এছাড়া বিএনপি ইভিএম পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনের বিরোধিতা করলেও স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়নি। আমরা জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি; আশা করি পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
সিটি নির্বাচন নিয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশের এসপি এবং সিটি করপোরেশনের আওতাধীন তিনটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও সংশয় রয়েছে জনমনে। তাদের একমুখী আচরণের বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলেছেন দু’দলের দুই মেয়র প্রার্থী। জেলার সরকারদলীয় একজন এমপিসহ নগরীর সুশীল সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত নাগরিক কমিটি, সচেতন নাগরিক ফোরাম, নগর উন্নয়ন কমিটির নেতারাও এ অভিযোগের সঙ্গে একাট্টা হয়েছেন। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা। এ অবস্থায় প্রার্থীরাসহ সাধারণ ভোটাররা নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি তুললেও নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় দেখা দিয়েছে হতাশা।

 

সূত্রঃ আমার দেশ | ৪ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in আমার দেশ. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s