চুয়াত্তরের আশায় আইভী

 নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন চেয়েছিলেন জনপ্রিয় শ্রমিকনেতা আলী আহাম্মেদ চুনকা। কিন্তু দলটি সমর্থন দেয় আরেক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী খোকা মহিউদ্দিনকে। সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন চুনকা। আর সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে খোকা মহিউদ্দিন হন তৃতীয়।
৩৭ বছর পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আবার আলোচনায় এসেছে চুয়াত্তরের সেই পৌর নির্বাচনের কথা। সেই আলী আহাম্মেদ চুনকার মেয়ে সাবেক পৌর মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবার মেয়র পদপ্রার্থী। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়েই বেড়ে ওঠা আইভী দলের সমর্থন চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রেও চুয়াত্তরের ইতিহাসের অনেকটা পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়েছে শামীম ওসমানকে। আর বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আইভীও লড়ছেন জনসমর্থনকে ভরসা করে।
আইভীর আশা, চুয়াত্তরে বাবার মতো তাঁকেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ নির্বাচিত করবে।
অন্যদিকে ৩০ অক্টোবরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মরিয়া শামীম ওসমান।
গত মঙ্গলবার শামীম ওসমানের পক্ষে দলীয় সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জজুড়ে এখন চুয়াত্তরের সেই নির্বাচন আবার আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার রাতেই শত শত মানুষ আইভীর বাড়ির সামনে ভিড় করে। তারা আইভীকে নির্বাচন থেকে পিছু না হটার জন্য অনুরোধ করে। জবাবে আইভী বলেন, যত বাধাই আসুক, তিনি নির্বাচনে থাকবেন।
১৯৭৪ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন রোকনউদ্দিন আহমেদ। এখন তিনি জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চুয়াত্তর সালের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছিলেন মহিউদ্দিন খোকা। নেতারা সবাই তাঁর পক্ষে কাজ করেছিলেন। আর জনতা ছিল আলী আহাম্মেদ চুনকার পক্ষে। তাই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন চুনকা। ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন মহিউদ্দিন খোকা।’ তিনি বলেন, এবার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে আইভীর ভোটের ব্যবধান আরও বেশি হতে পারে। কারণ, জনতার সমর্থন আইভীর পক্ষে। তবে ভোট ছিনতাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
চুয়াত্তর সালে তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আনোয়ার হোসেন। তিনি এখন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলীয় সমর্থন পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে এখন আর কিছু আসে-যায় না। সাধারণ ভোটাররা আইভীর পক্ষে। তাঁদের চাপেই আইভী নির্বাচন করছেন। আমাদের বিশ্বাস, চুয়াত্তর সালের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আইভী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।’
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, ‘১৯৭৪ সালে আমি শ্রমিক লীগের নেতা ছিলাম। সে সময় জনপ্রিয় শ্রমিকনেতা আলী আহাম্মেদ চুনকা গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌর নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের জন্য। তিনি তা পাননি। এরপর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চুনকা আবারও গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, “আমি জানতাম চুনকা, তুই জিতবি।” ৩৭ বছর পর বাবার মতোই পরিস্থিতিতে আছেন আইভী।’
জানতে চাইলে সেলিনা হায়াৎ আইভী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলীয় সমর্থনের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু এ কথা বলতে পারি, নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ আমার নেই।’
সন্ত্রাস ও গডফাদারমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে সাধারণ মানুষ তাঁর দিকে চেয়ে আছে উল্লেখ করে আইভী বলেন, ‘এই জনতাকে সঙ্গে নিয়েই আমি নির্বাচন করতে চাই। তবে আমি কখনো আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাইনি। কখনো যাবও না। আমার বাবাও কখনো পালিয়ে যাননি। কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেইমানি করেননি। আমিও করব না।’
চাঙা ওসমান শিবির: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় সমর্থন পাওয়ার পর শামীম ওসমানের শিবিরও এখন চাঙা। তাঁর সমর্থকদের দাবি, এই নির্বাচন শামীম ওসমানের জন্য রাজনীতিতে ফেরার লড়াই। তাই বিজয়ী হতে সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সারা দিন প্রচার-জনসংযোগে মাঠে আছেন তিনি।
একই সঙ্গে আইভীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে নানাভাবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বলেন, ‘দল শামীম ওসমানকে এই নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছে। এখন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আইভীর নির্বাচন করা ঠিক হবে না। তাঁর উচিত, শামীম ওসমানের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো।’
৩০ অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শামীম ওসমান। তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আমাকে আগেই সমর্থন দিয়েছে। তারা চাইছে, আমি নির্বাচন করি। সে অনুযায়ী দল আমাকে সমর্থন দিয়েছে। আমি মনে করি, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যাচাই হবে।’
আইভীর নির্বাচন করা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি এখন নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে আমার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। আমি তাঁকে এ ব্যাপারে বুঝিয়েছি। আশা করি, তাঁর ভুল ভাঙবে।’

 

সূত্রঃ প্রথম আলো | ২০ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in প্রথম আলো. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s