এখন কী বলবেন শামীম ওসমান?

 দুর্জনের ছলের অভাব হয় না।
নির্বাচনের আগে শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘সেলিনা হায়াৎ আইভী পাঁচ হাজার ভোটের বেশি পাবেন না।’ কিন্তু সেই আইভী বিশাল ভোটের ব্যবধানে তাঁকে হারিয়ে প্রমাণ করেছেন, সন্ত্রাস নয়, জনগণই ক্ষমতার উৎস।
নারায়ণগঞ্জে গতকাল ভোটবিপ্লব হয়েছে। শান্তির পক্ষে। ন্যায় ও সততার পক্ষে। উন্নয়নের পক্ষে। ভোটবিপ্লব হয়েছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। পেশিশক্তি, কালোটাকার বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে। এ নির্বাচনে আইভীর পক্ষে ছিল জনতা, শামীমের পক্ষে ছিলেন নেতা। শেষ পর্যন্ত জনতারই বিজয় হয়েছে। এ জন্য আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন জানাই।
নির্বাচনের আগে শামীম ওসমান বলেছিলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, এখন বলছেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কে কারচুপি করেছে? গতকাল যাঁরা নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন, যাঁরা পর্যবেক্ষক ছিলেন, তাঁরা দেখেছেন কীভাবে শামীম ওসমানের সমর্থকেরা বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। পুলিশ ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছেন। এমনকি শামীম ওসমান নিজেও তোলারাম কলেজের ছাত্রলীগের নেতা নাজিমুদ্দিন রনিকে মারধর করেছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে র‌্যাবের কর্মকর্তারা শামীম ওসমানকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বলেছেন, আপনি এখানেই থাকুন।
যে শামীম ওসমানকে তাঁরা জনতার রোষ থেকে রক্ষা করেছেন, এখন সেই শামীম ওসমানই তাঁদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, ‘সাজানো নির্বাচন হয়েছে। আগে জানলে নির্বাচনে অংশ নিতাম না।’
নির্বাচনে প্রমাণিত হলো, তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগ থাকলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ ছিল না।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনেক ঘটনা-অঘটনের জন্ম দিয়েছে। জাতির সামনে অনেক প্রশ্ন রেখে গেছে। তার কিছু উত্তর গতকাল পাওয়া গেছে। কিছু উত্তর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। কিছু প্রশ্নের উত্তর কোনো দিনই পাওয়া যাবে না। যেমন, শামীম ওসমান গুজব ছড়িয়েছিলেন যে জঙ্গি হামলা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, অভিযোগ মিথ্যা হলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলসহ তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। জঙ্গিবাদবিরোধী সরকার কী শাস্তি দেয়, আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
এ নির্বাচনে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটির উত্তর পেয়েছি, তা হলো জনরায়। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। সন্ত্রাস করে, মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা কালোটাকা ছড়িয়েও যে সেই রায় বদলে দেওয়া যায় না, নারায়ণগঞ্জের মানুষ তা আবারও প্রমাণ করলেন।
এ নির্বাচনে প্রমাণিত হলো, জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে না। ভুল করেন আমাদের নেতা-নেত্রীরা। ভুল করে সরকার, ভুল করে বিরোধী দল, যার খেসারত এ জাতিকে ৪০ বছর ধরে দিতে হয়েছে।
এ নির্বাচনের মাধ্যমে আরও প্রমাণিত হলো, দল বা প্রতীক নয়; মানুষ প্রার্থীকে বেছে নেন। কেননা নির্বাচন থেকে তৈমুর আলম খন্দকার সরে দাঁড়ানোর পর মেয়র পদে দুই প্রধান প্রার্থী ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী ও শামীম ওসমান। তাঁরা দুজনই আওয়ামী লীগের। অথচ কত তফাত।
এ নির্বাচনে কয়েকটি অঘটন।
প্রথম অঘটন হলো, শামীম ওসমানের প্রতি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমর্থন। প্রথমে রাখঢাক থাকলেও পরে কেন্দ্রীয় নেতারা সদলবলে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছেন। তবে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে দলীয় সংহতির চেয়েও বেশি ছিল ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য। তাঁদের অনেকেই শামীম ওসমানের মতো ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গা ঢাকা দিয়েছিলেন, বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় অঘটন হলো, সিদ্ধান্ত নিয়েও নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েন করতে পারেনি। এর মাধ্যমে সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। এর বিরুদ্ধে রিট হয়েছে। আমরা রিটের ফল জানতে চাই।
তৃতীয় অঘটন হলো, বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানো। কাজটি আত্মঘাতী। দলকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে অপমানিত হয়েছেন এবং নারায়ণগঞ্জের ভোটারদের বঞ্চিত করেছেন।
তিনি দলের কথায় নির্বাচন কমিশনকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলেনির্বাচন কমিশন তার ভাবমূর্তিপুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে তৈমুর আলম খন্দকারের ভাবমূর্তিএখন শূন্যের কোটায়। দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য কাউকে যোগ্য রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। তিনি তাই প্রমাণ করলেন।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণযে কথাটি বলা প্রয়োজন, তা হলো—শেষ এবং চূড়ান্ত অঘটনটি নারায়ণগঞ্জবাসীঘটতে দেয়নি। তারা সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন এবং জনতার প্রার্থীকেই বিজয়ী করেছেন। এ জন্য তাদের আবারও ধন্যবাদ জানাই।
 সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

সূত্রঃ প্রথম আলো | ৩১ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in প্রথম আলো. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s