সেনা ছাড়া গোলমাল হবে এ আশঙ্কা ছিল অমূলক | মন্তব্য নারায়ণগঞ্জের ভোটারদের

সেনা মোতায়েন ছাড়াও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে সেনাবাহিনীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সব বিষয়ে না জড়ানো এবং অপরদিকে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দেশবাসীর আস্থা অর্জনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এ নির্বাচন। আগামীতে জাতীয় নির্বাচনও সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠুভাবে হওয়া সম্ভব। রবিবার নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সেনা মোতায়েন না হলেও ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। জনকণ্ঠের কাছে প্রতিক্রিয়ায় তারা জানিয়েছেন, ভোটের আগের দিন কিছুটা শঙ্কা কাজ করেছে। তবে ভোট দিতে এসে তাঁরা দেখেছেন গোলমালের আশঙ্কা ছিল অমূলক।
নির্বাচনী এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনা মোতায়েন না হলেও শেষ মুহূর্তে শনিবার দ্বিগুণ র্যাব মোতায়েন করে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। র্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয় স্কোয়াড ও ডগ স্কোয়াডও ছিল মজুদ। প্রথমবারের মতো দেশের কোন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে বসানো হয় সিসিটিভি। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি কেন্দ্রে স্থাপিত নিয়ন্ত্রিত হয় শহরের জিয়া হলে নির্মিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে। প্রত্যেকটি মনিটর পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন একাধিক আইটি প্রশিক্ষিত যুবক। এছাড়া পুরো টিমটির সুপারভিশনের দায়িত্বে ছিলেন একজন কর্মকর্তা।
নারায়ণগঞ্জ শহর ও বিভিন্ন স্থানে শনিবার থেকেই ছিল র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মহড়া। নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাস্তায় নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত গাড়ি, মিডিয়ার গাড়ি, অল্প কিছুসংখ্যক রিকশা ছাড়া আর কোন বাহন ছিল না। ফলে রাস্তা ছিল প্রায় যানবাহনশূন্য। মূলত রিকশা করেই ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন ভোটাররা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল থাকায় ভোটারদের মধ্যেও কোন ভয়-ভীতি দেখা যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী কেন্দ্রে সস্ত্রীক ভোট দিতে আসেন ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, শনিবার রাতেও ভয় পেয়েছিলাম ভোট দিতে আসব কি না। সেনাবাহিনী মোতায়েন না হওয়ায় সবাই বলছিল কেন্দ্রে গোলমাল হতে পারে। অথচ এসে দেখলাম কোন সমস্যাই নেই। শানত্মিপূর্ণভাবেই ভোট দিয়েছি।
ওই কেন্দ্রের আরেক ভোটার শহীদুল ইসলাম বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন না হলেও পরিবেশ অত্যনত্ম ভাল রয়েছে।
তোলারাম কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে টানবাজার থেকে আসা প্রবীরচন্দ্র বলেন, বাড়ি থেকে আসার পথে কোন ধরনের গোলমালই চোখে পড়েনি। আমার স্ত্রী, ছেলে আর ছেলের বউ ভোটার। পরিস্থিতি যাচাইয়ে আমি আগে এসেছি। শানত্মিপূর্ণভাবে ভোট হওয়ায় পরে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসে ভোট দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরম্নণী নাজিয়া নওরীন জানান, তিনি হেঁটেই কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছেন। আসার পথে কোন সমস্যা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ছিল রাসত্মায়। তাই কোন ভয়ও কাজ করেনি।
মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা জাহাঙ্গীর আলমের মতে, সেনাবাহিনী ছাড়াও ভোট সুষ্ঠু হতে পারে। তিনি বলেন, সরকার চাইলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পারে। এর জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন জরম্নরী নয়। আনত্মরিকতাই প্রয়োজন।
উলেস্নখ্য, এ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে নানান নাটক হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে শুক্রবার ভোর থেকে সেনা মোতায়েনের কথা থাকলেও তা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়, নির্বাচন কমিশন। বরাবরই কমিশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে আগ্রহী না হলেও প্রার্থীদের চাপে এবার সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেয়। তবে নির্দেশের পরও সেনা মোতায়েন না হওয়াটা কমিশন ভাল চোখে দেখেনি। এ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেছিলেন, এ নির্বাচনে সরকারের অমনোযোগিতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে সেনা মোতায়েন না হওয়াকে কারণ দেখিয়ে শনিবার মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় নির্দেশে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার। যার প্রভাব পড়েছে নির্বাচনী ফলে। তবে সেনা মোতায়েন না হওয়ায় তার নির্বাচন বর্জনের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কোন প্রভাব পড়েনি।
শনিবার র্যাব কর্তৃপক্ষ জানায়, একজন প্রার্থী জঙ্গী হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করলেও তারা এ ধরনের হামলার কোন আলামত পাননি। পুরো নারায়ণগঞ্জ নিরাপত্তা চাদরে ঘিরে ফেলতে মোট ১৪শ’ র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনা মোতায়েন না হওয়ায় শনিবার হঠাৎ করেই র্যাবের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়। এর আগে ৭শ’ র্যাব মোতায়েনের কথা ছিল। এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিস থেকে জানানো হয়েছে, এখন পর্যনত্ম নির্বাচন নিয়ে কোন শঙ্কার সৃষ্টি হয়নি। যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। আশা করা যায়, ভোটের সময় ও ভোট পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
র্যাব ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য ছিলেন এ নির্বাচনে। প্রতিটি কেন্দ্রে ছিল পুলিশ ও আনসারের ২৪ সদস্য। পুলিশের টহল টিম ছিল ৮২টি। প্রতিটি টিমে একজন উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে ছিল পাঁচজন করে সদস্য। ২৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ছিল পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স।
সাধারণ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রসহ সাতজন পুলিশ, ব্যাটালিয়ন আনসার একজন, ১৪ জন আনসার ও ভিডিপিসহ মোট ২২ জন দায়িত্ব পালন করেছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ছিল ২৪ সদস্য।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর ও ফতুলস্নায় ছিল রিজার্ভ ফোর্স। ফতুলস্না সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে হলেও নির্বাচন এলাকার পাশে হওয়ায় সেখানেও জোরদার করা হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়াও নদীতে ছিল কোস্ট গার্ড। নির্বাচনের দিন ছিলেন নয়জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ২৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

সূত্রঃ জনকণ্ঠ | ৩১ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in জনকণ্ঠ. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s