আইভীর নিরঙ্কুশ বিজয়


বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রথম মেয়রের মুকুট উঠেছে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মাথায়। তিনি দোয়াত-কলম প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৬৩টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বশেষ প্রাপ্ত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী ১৩২টি কেন্দ্রে পেয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ৩১৯ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শামীম ওসমান দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৯০০ ভোট। সব শংকা ও আতংকের অবসান ঘটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বহুল আলোচিত এ নির্বাচন। হঠাৎ বড় কোন অঘটন ঘটতে পারেÑ দিনভর নির্বাচনী এলাকায় এ আশংকা থাকলেও আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর নজিরবিহীন দৃঢ়তায় দিন শেষে সবকিছু মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভোর না হতেই ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, পুলিশ, র‌্যাব, স্ট্রাইকিং মোবাইল ফোর্সের সার্বক্ষণিক টহল, রিটার্নিং অফিসারের দৃঢ় মনোভাব- সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনী এলাকায় ছিল আস্থার পরিবেশ। সকাল ৮টা না বাজতেই প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের সামনে দেখা যায় ভোটারদের লম্বা লাইন। বেলা যত বাড়তে থাকে, তত বাড়তে থাকে ভোটারের উপস্থিতি। নির্বাচনী এলাকায় ভোট কেন্দ্রের উদ্দেশে যাওয়া সারি সারি মহিলা ও পুরুষ ভোটারের মিছিল ছিল চোখে পড়ার মতো। যারা অজানা আতংকে ঘরে গুটিয়ে ছিলেন, সুন্দর পরিবেশ দেখে তারাও রওনা হন পরিবার-পরিজন সঙ্গে নিয়ে ভোট কেন্দ্রের উদ্দেশে। সকালে রিটার্নিং অফিসার বিশ্বাস লুৎফুর রহমান কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে এসে বললেন, ‘দোয়া কইরেন, বিকালটা য্যান সকালের মতো হয়।’ বিকালে রিটার্নিং অফিসার বললেন, অত্যন্ত সুন্দরভাবে নির্বাচন হচ্ছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে ভোটাররা উৎফুল্ল। ভোট গণনাকালে মাঠে মোতায়েন থাকা সব আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নিজের ভোটটি দেয়ার পর ভোটাররা একবাক্যে বললেন, এত সুন্দর নির্বাচন আগে নারায়ণগঞ্জে হয়নি। এরকম ভোটে যে জিতবে তাকে ধন্যবাদ। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগের দিন নাটকীয়ভাবে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন অন্যতম মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার। এর আগের দিন সব ঠিকঠাক করার পরও সরকার সেনা মোতায়েনে ইসিকে কোন সহায়তা করেনি। এত সব নাটকীয়তার পর আতংক যখন সবার বুকে চেপে বসেছে, তখন ভোট গ্রহণের দিনের সূর্যটি উঠল যেন ভিন্ন রূপ নিয়ে। সকালের হালকা মিষ্টি রোদ যেন ভোটারদের জন্য নিয়ে এলো নতুন বারতা। আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী বিশেষ করে র‌্যাবের ব্যাপক উপস্থিতি, অলিগলিতে সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারি রোববার নারায়ণগঞ্জবাসীকে সেনা মোতায়েন না হওয়ার হতাশা পুরোটাই ভুলিয়ে দেয়। অবসান হল সব ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার।
নির্বাচন কমিশনাররা যা বলেন-
ছহুল হোসাইন : ভোট গ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, ‘আমরা যেরকম আশা করেছিলাম, ঠিক সেভাবে নির্বাচন হয়েছে। ভোটাররা অবাধে ভোট দিয়েছেন। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এ ধরনের নির্বাচন করতে পেরে আমরা সন্তুষ্ট।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন : এ নির্বাচন কমিশনার ভোট গ্রহণ শেষে বলেন, নির্বাচন নিয়ে সব ভোটার খুশি, আমরাও খুশি। এ ধরনের সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী, ভোটার, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী- সবাইকে ধন্যবাদ জানান এ নির্বাচন কমিশনার। রোববার সারাদিন কিছুক্ষণ পর পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন এই দুই নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন নিয়ে সারাদিন উৎকণ্ঠায় ছিল নির্বাচন কমিশন। তীরে এসে তরী ডুববে কিনা- এ ভয় ছিল কমিশনে। ভোট গ্রহণের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা।
রিটার্নিং কর্মকর্তা বিশ্বাস লুৎফুর রহমান : পুরো মাস নানা শংকায় শংকিত থাকা রিটার্নিং অফিসার বিশ্বাস লুৎফুর রহমানের মুখে রোববার ছিল স্বস্তির হাসি। ভোট গ্রহণ শেষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই ছিল। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর শক্ত অবস্থান ও কমিশনের দৃঢ়তার কারণে এ চ্যালেঞ্জে আমরা জয়ী হয়েছি। তিনি সব প্রার্থী এবং ভোরটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আপনাদের সহযোগিতা না পেলে আমরা সফলতা পেতাম না।
ভোট গ্রহণ চলাকালে তিন মেয়র প্রার্থী যা বলেন
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী : নিজের ভোটটি দেয়ার পর এ প্রার্থী কয়েকটি কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে সরেজমিন গিয়ে এ অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। এ প্রার্থী বলেন, ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে আমি নিজেও সন্তুষ্ট। পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলে জানান তিনি। এলাকার ভোটাররা সেনাবাহিনীর ভূমিকায় আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ সুন্দর পরিবেশ অব্যাহত রাখতে তিনি রিটার্নিং অফিসারের প্রতি আহ্বান জানান।
শামীম ওসমান : সকালে ভোটদান শেষে শামীম ওসমান বলেন, ভোটাররা সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারছেন। আমি আমার ভোটটি ভালোমতো দিতে পেরেছি। বেলা আড়াইটায় পাল্টে যায় সকালের বক্তব্য। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘পুলিশ ইজ কমপ্লিটলি বায়াসড’ (পুলিশ সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট)। পুলিশ আইভীর পক্ষে মাঠে নেমেছে। পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করার জন্য জামায়াত আইভীকে টাকা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, পুলিশ আইভীকে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার বলার পরও আমার অভিযোগ কানে নেয়া হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে রনি নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীকে অপমান করেন শামীম ওসমান।
শামীম ওসমান ছাত্রলীগ কর্মীর শার্টের কলার চেপে ধরলে র‌্যাব তাকে উদ্ধার করে। কেন্দ্র পরিদর্শনকালে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেন শামীম ওসমান। শামীমকে ঠেকাতে বিএনপি, জামায়াত, ওয়ান ইলেভেন সব এক হলেও পারবে না বলে জানান তিনি।
তৈমুর আলম খন্দকার : ভোট গ্রহণ শুরুর মাত্র সাড়ে ৬ ঘণ্টা আগে নির্বাচন থেকে নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়ান অন্যতম মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার। তিনি রোববার সারাদিন মাসদাইরের নিজ বাড়ির বারান্দায় বসে সময় কাটান। রোববার দুুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ২০-৩০ জন নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন তৈমুর। সবার মুখ বিমর্ষ। তৈমুর মাঝে মাঝে পত্রিকা পড়ছেন, মোবাইলে কথা বলছেন। তৈমুর জানান, ‘আমরা সেনাবাহিনী ছাড়া এলাকায় চলাফেরা করি না? শুধু আমার নেত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। নির্বাচন করলে আমি বিপুল ভোটে জয়ী হতাম। আমার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।’ শনিবার রাতে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তৈমুর তার কর্মী-সমর্থককে এ নির্বাচন বর্জনের তাগিদ দেন। কিন্তু রোববার ছোট ভাই খোন্দকার মোরশেদ ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার কর্মী-সমর্থকরা ব্যস্ত ছিলেন কাউন্সিলর পদ নিয়ে। তৈমুরের বাড়ির সামনে কথা হয় এক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে। ভোট দিয়েছেন কিনা? এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘দেব না ক্যান, আমরা আনারসের রস দিয়ে কলমের কালি বানাব।’ আনারস তৈমুরের প্রতীক। আর আইভীর দোয়াত-কলম।
ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা যা বলেন : ইভিএম নিয়ে সন্তুষ্টি ১৩নং ওয়ার্ডে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট দেয়া শেষে কথা হয় কামরুল হাসান ড্যানির সঙ্গে। এ ভোটার বলেন, ‘আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া নির্বাচনটা ঝামেলা ছাড়া চলতেছে।’ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট দিয়ে তিনি সন্তুষ্ট বলে জানান এ ভোটার।
পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর ১টার মধ্যেই ৭০ শতাংশ ভোট গ্রহণ শেষ। এ কেন্দ্রের ভোটার ফারজানা পারভীন বলেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে খুব সহজে ভোট দিয়েছি। কোথাও কোন গ্যাঞ্জাম নেই।’ এ ভোটার তার তিন বছরের ছেলে মিশুকে নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে।
জয় গোবিন্দ হাইস্কুল কেন্দ্রে গিয়ে বেলা ১১টায় দেখা যায়, ভোটারদের দীর্ঘলাইন। কেন্দ্রের ভোটার আছিয়া আক্তার জানান, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দু’ঘণ্টা ধরে লাইনে আছেন। এ ভোটারের ভাষ্য, ‘নির্বাচন অইলে এমন হওয়া দরকার।’ রোববার ৯টি ওয়ার্ডের ৫৮টি কেন্দ্রে মেশিনে ভোট দেয় ভোটাররা। তরুণ ও বৃদ্ধ ভোটারদের মধ্যে মেশিন নিয়ে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। মেশিনে টিপ দেয়ার পর ভোটটি পছন্দের প্রার্থী পেল কিনা এ কৌতূহল ছিল ভোটারদের মধ্যে।
হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় : ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে ফলের জন্য। চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তা লোকে-লোকারণ্য হয়ে যায়। বিশেষ করে ফল ঘোষণার স্থান জিয়া হলের সামনে মানুষের জট লেগে যায়। এ জট ছাড়াতে বেগ পেতে হয় র‌্যাবকে। ভোট গণনা চলাকালে প্রতিটি কেন্দ্রের সামনে ছিল শত শত ভোটারের অবস্থান। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে র‌্যাবের বিশেষ টিম বহাল ছিল গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
শামীম-আইভীর বাসার সামনে : সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলের খবর আসতে থাকে। আইভীর দেওভোগের বাসার সামনে জড়ো হয় হাজার হাজার কর্মী সমর্থক। তাদের জিয়া হলের সামনে থাকার অনুরোধ জানান আইভী। ভোট গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সমর্থকদের জিয়া হলের সামনে থাকার অনুরোধ জানান। কোন রকম মিছিল থেকে তাদের বিরত থাকার জন্য বারবার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর শামীমের চাষাঢ়ার বাসভবনে ছিল শ্মশানের নীরবতা। কিছু নেতাকর্মী উপস্থিত থাকলেও সবার মুখে ছিল বিষাদের ছায়া। শামীম ওসমান যে পরাজিত হচ্ছেন এ সময় এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে গেছে নেতাকর্মীরা।
সিইসির বক্তব্য : আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়াÑ এ নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সব আতংক কেটে গেছে। এর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জবাসী প্রমাণ করেছে ভোটার অর্থাৎ জনগণ ভোট কেন্দ্রে গেলে কেউ কিছু করতে পারে না। তিনি ভোটারদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। নির্বাচন-উত্তর পরিবেশও সুষ্ঠু থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সিইসি।

সূত্রঃ যুগান্তর | ৩১ অক্টোবর ২০১১

This entry was posted in যুগান্তর. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s